বুধবার । ২৫শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ । ১২ই ফাল্গুন, ১৪৩২
সচিবালয়কেন্দ্রিক অফিস কার্যক্রম, নির্বাহী প্রধানের নতুন দৃষ্টান্ত

প্রশাসনিক গতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের সম্ভাবনা

মো. রবিউল ইসলাম

বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রশাসনিক সংস্কার ও কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বে‌শি না বসে সরাসরি সচিবালয়ে অফিস করছেন—এটি কেবল একটি স্থান পরিবর্তন নয়, বরং প্রশাসনিক দর্শনের একটি গভীর পরিবর্তন হিসেবে দেখা যেতে পারে। এই সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য সুবিধা ও ভবিষ্যৎ ইতিবাচক দিকগুলো বিশ্লেষণ হওয়া জরুরি।

প্রশাসনিক কাজে সমন্বয় বৃদ্ধি
বাংলাদেশ সচিবালয় দেশের মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কেন্দ্রবিন্দু। প্রধানমন্ত্রী যদি সরাসরি সচিবালয়ে বসেন, তাহলে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি ও দ্রুত সমন্বয় সম্ভব হবে।

এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় কমবে, ফাইল জট কমতে শুরু করবে। আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সমন্বয় আরও শক্তিশালী হবে, ফলে প্রশাসনের গতি বাড়বে এবং নীতিনির্ধারণ আরও বাস্ততবভিত্তিক হবে।

আমলাতন্ত্রের জবাবদিহিতা বৃদ্ধি
সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি কর্মকর্তাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ বাড়াতে পারে। বহু বছর ধরে আমলাগণ সচিবালয়ে ছিলেন কোনোরকম জবাবদিহিতাবিহীন। অফিসে কখন আসেন, কখন ফিরে যান, কোন কাজটি করেন আর কোনটা ফেলে রাখেন তা অনেকটাই ছিল তাঁদের ইচ্ছামাফিক। ফলে প্রধানমন্ত্রী সকাল ৯ টায় উপস্থিত হতে পারলেও অনেক সচিবই যথাসময়ে উপস্থিত হতে ব্যর্থ হচ্ছেন। কারণ এটি তাদের স্বভাবে ছিল না। ইতোমধ্যে সচিবগণ যথাসময়ে অফিসে আসার তাগিদ অনুভব করায় সারাদেশে সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্ধারিত সময় অনুযায়ী অফিসে উপস্থিতি ও প্রস্থান নিশ্চিত করার নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

এর অর্থ দাঁড়ায় ইতোপূর্বে যথাসময়ে উপস্থিতির বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে দেখাই হয়নি। ফলে এখন কর্মকর্তাদের নিয়মানুবর্তী হওয়ার জন্য তড়িঘড়ি করে নির্দেশনা জারি করার প্রয়োজন হয়ে পড়ছে।

প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রীরা সরাসরি সচিবালয়ে অফিস করায় সরকারি নীতির বাস্তবায়ন সরাসরি পর্যবেক্ষণ সম্ভব হবে, সাচিবিক কর্মক্ষমতা মূল্যায়ন সহজ হবে, দুর্নীতি বা অনিয়ম দ্রুত চিহ্নিত করা যাবে।

এর ফলে প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পেতে পারে।

কেন্দ্রীয়করণ কমিয়ে কার্যকর বিকেন্দ্রীকরণ
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ইতোপূর্বে একটি পৃথক ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে। সচিবালয়ে বসলে প্রশাসনিক কার্যক্রম একটি অভিন্ন কাঠামোর মধ্যে দিয়ে পরিচালিত হবে। ফলে নীতি ও বাস্তবায়নের ব্যবধান কমবে, সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে, প্রশাসনিক স্তরে অপ্রয়োজনীয় দূরত্ব কমবে।

প্রতীকী বার্তা: সাদামাটা ও কর্মমুখী নেতৃত্ব
সচিবালয়ে বসা একটি প্রতীকী বার্তা বহন করতে পারে— নেতৃত্ব জনগণের প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতর থেকেই কাজ করছে। এটি “অফিস-ভিত্তিক শাসন” থেকে “মাঠমুখী ও প্রশাসন-সংযুক্ত শাসন”- এর ধারণাকে আরও পাকাপোক্ত করবে।

ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য নিম্নোক্ত ইতিবাচক প্রভাবগুলো দৃশ্যমান হবে।

১. নীতির দ্রুত বাস্তবায়ন – বড় অবকাঠামো, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রকল্প দ্রুত অগ্রসর হতে পারে।

২. ডিজিটাল গভর্নেন্সে গতি – সচিবালয়ভিত্তিক সরাসরি মনিটরিং ডিজিটাল ফাইল ব্যবস্থাপনা ও ই-গভর্নেন্সকে উৎসাহিত করবে।

৩. প্রশাসনিক সংস্কার – দীর্ঘমেয়াদে এটি প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠনের একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে চর্চিত হবে।

৪. জনআস্থা বৃদ্ধি – জনগণ ইতোমধ্যে মনে করতে শুরু করেছে যে, এখন সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া আরও সরাসরি ও কার্যকর হবে

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সচিবালয়ে অফিস স্থানান্তর— এটি কেবল একটি কক্ষ বা ভবন বদলের সিদ্ধান্ত নয়; এটি প্রশাসনের দর্শন, সংস্কৃতি ও কর্মপদ্ধতির একটি সুনির্দিষ্ট রূপান্তরও বটে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রীর এই পদক্ষেপ মূলতঃ নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের কেন্দ্রবিন্দুকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত করা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি বাড়ানো এবং মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে সরাসরি সমন্বয় জোরদারের একটি সুস্পষ্ট বার্তা ।

খুলনা গেজেট/এএজে




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন